মেহেদী হাসান :
বলিউডের নব্বই দশকের সবচেয়ে উজ্জ্বল নায়িকাদের নাম যখন উচ্চারিত হয়, সেখানে জুহি চাওলার নাম প্রথম সারিতেই থাকে। তিনি এমন এক সময় বলিউড দখল করেছিলেন, যখন ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন মাধুরী দীক্ষিত, শ্রীদেবী, কাজলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী তারকারা। তবুও নিজস্ব হাসি, মিষ্টি উপস্থিতি আর স্বাভাবিক অভিনয়ের গুণে জুহি হয়ে উঠেছিলেন কোটি দর্শকের প্রিয় নায়িকা। সময়ের সাথে তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী হিসেবেও নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

জুহি চাওলার জন্ম ১৯৬৭ সালের ১৩ নভেম্বর, ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের অম্বালায়। শৈশব কেটেছে এক সাধারণ পরিবারে, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে ছিল শিল্পের ঝোঁক। স্কুলজীবনেই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু করেন, আর ১৯৮৪ সালে জয় করেন মিস ইন্ডিয়া খেতাব। সেই সাফল্যই তাঁকে এনে দেয় সিনেমার জগতে প্রবেশের সুযোগ।

১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সুলতানাত’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন জুহি। যদিও ছবিটিতে তার ভূমিকা ছোট ছিল, কিন্তু তা-ই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম পরিচয়। সত্যিকারের আলোচনায় আসেন ১৯৮৮ সালে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ সিনেমার মাধ্যমে। আমির খানের বিপরীতে অভিনয় করা এই ছবিটি বলিউডে এক যুগান্তকারী রোমান্টিক হিট হয়ে ওঠে। গান, গল্প, অভিনয়-সব মিলিয়ে ছবিটি জুহিকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। সেই বছরই তিনি পান ফিল্মফেয়ারের শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেত্রীর পুরস্কার।

নব্বইয়ের দশকটা ছিল পুরোপুরি জুহির সময়। একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি-‘বল রাধা বল’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’, ‘ইয়েস বস’, ‘ইশ্ক’, ‘রাজু বান গয়া জেন্টলম্যান’, ‘ডর’, ‘লুটেরে’-প্রতিটি ছবিতেই দর্শক তাঁকে ভীষণ ভালোবেসেছে। তার হাসি, সংলাপ বলার ধরন, রোমান্টিক অভিনয়ের নৈপুণ্য তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল অন্যদের থেকে। বিশেষ করে ‘ডর’ ছবিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে তার অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।

২০০০ সালের দিকে জুহির ক্যারিয়ারে আসে নতুন অধ্যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনায় যুক্ত হন তিনি। শাহরুখ খান ও আজিজ মির্জার সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন “ড্রিমজ আনলিমিটেড” নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সেই সময় মুক্তি পায় ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ ও ‘আশোকা’র মতো সিনেমা। যদিও এগুলো বাণিজ্যিকভাবে খুব বড় হিট হয়নি, তবু জুহির উদ্যোক্তা মনোভাবের শুরুটা এখান থেকেই।

এরপর থেকে ধীরে ধীরে তিনি সিনেমা থেকে কিছুটা দূরে সরে আসেন। ২০১০-এর পর তিনি বেছে বেছে কাজ করতে থাকেন। সামাজিক ও অর্থবহ বিষয়বস্তুর চলচ্চিত্রে অংশ নেন, যেমন অনুরাগ কাশ্যপ পরিচালিত ‘আই অ্যাম’-যেখানে তার অভিনয় প্রশংসিত হয় সমালোচকদের কাছে। ২০১২ সালে ‘সন অব সারদার’ ও ২০২৩ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফ্রাইডে নাইট প্ল্যান’-এ দেখা গেছে তাঁকে। বয়স বাড়লেও তার ব্যক্তিত্ব ও গ্ল্যামার যেন একটুও কমেনি।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজের মনোযোগ দেন ব্যবসা ও বিনিয়োগে। আজ তিনি শুধু একসময়ের তারকা নন, ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেত্রী। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদ প্রায় ৭ হাজার ৭৯০ কোটি রুপি, যা কোনো বলিউড অভিনেত্রীর জন্য রেকর্ড। গত এক বছরেই তিনি সম্পদ বাড়িয়েছেন ৩ হাজার ১৯০ কোটি রুপি। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)-এর মালিকানা।

জুহি চাওলা, তাঁর স্বামী জয় মেহতা ও শাহরুখ খান মিলে কেকেআরের সহমালিক। ২০০৮ সালে যখন দলটি কেনা হয়, তখনই জুহির বুদ্ধিমত্তা বোঝা গিয়েছিল। ব্যবসার সুযোগ ধরার তার সক্ষমতা পরবর্তীতে বাস্তব প্রমাণে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের আইপিএলে কেকেআর শিরোপা জেতার পর দলের ব্র্যান্ড ভ্যালু হু হু করে বেড়ে যায়। এখন কেকেআরের বাজারমূল্য ১ হাজার ৯১৫ কোটি রুপিরও বেশি। শুধু ক্রিকেট নয়, তিনি রিয়েল এস্টেট ও বিভিন্ন কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করেছেন।
জুহির স্বামী জয় মেহতা একজন সুপরিচিত শিল্পপতি। তাঁরা ১৯৯৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক মেয়ে জাহনাভি ও এক ছেলে অর্জুন রয়েছে। জুহি পরিবারকে সব সময় প্রাধান্য দেন এবং সন্তানদের আলোচনার বাইরে রাখতে পছন্দ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সংযত ও ধার্মিক প্রকৃতির। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও তিনি সক্রিয়। গাছ লাগানো ও প্লাস্টিকবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন একাধিকবার।

শাহরুখ খানের সঙ্গে তার দীর্ঘ বন্ধুত্ব ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বলিউডের অন্যতম আলোচিত বিষয়। যদিও একসময় তাঁদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সম্পর্কের মধ্যে সামান্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তবু বন্ধুত্ব অটুট ছিল সবসময়। কেকেআরের প্রতিটি সাফল্যে আজও তাঁদের দুজনকে পাশাপাশি দেখা যায়।
জুহি চাওলা আজকের দিনে কেবল একজন সাবেক নায়িকা নন, তিনি ভারতের সবচেয়ে সফল নারী বিনিয়োগকারীদের একজন। মডেলিং থেকে শুরু করে বলিউড জয়, সেখান থেকে ক্রিকেট দল মালিকানা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দেখিয়েছেন নিজস্ব মেধা ও পরিশ্রমের প্রতিফলন।জুহির জীবন আসলে এক অনুপ্রেরণার গল্প-যেখানে গ্ল্যামার, সংগ্রাম, বুদ্ধিমত্তা ও সাফল্য একসূত্রে গাঁথা। সিনেমায় তিনি শেখান কীভাবে হাসি দিয়ে হৃদয় জেতা যায়, আর ব্যবসায় তিনি প্রমাণ করেছেন, দূরদর্শিতা থাকলে পর্দার বাইরেও তারকার আলো নিভে যায় না।