ঢাকার পুর্বানি হোটেল থেকে বলিউডের খিলাড়ি: অক্ষয় কুমারের অনুপ্রেরণার গল্প

ফারহান তানভীর :

অক্ষয় কুমার-বলিউডের জনপ্রিয় নায়ক, যিনি আজ কোটি ভক্তের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। অ্যাকশন, কমেডি, রোমান্স-প্রায় প্রতিটি ঘরানার ছবিতেই সমান দক্ষতায় অভিনয় করেছেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের শুরুটা এত সহজ ছিল না। আজকের সফল নায়ক হয়ে ওঠার পেছনে আছে লড়াই, পরিশ্রম আর ধৈর্যের দীর্ঘ পথ। সেই পথে এক সময় এসে পড়েছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও।

ছবিতে অক্ষয় কুমার

আশির দশকের শেষ দিকে তরুণ অক্ষয় কুমার জীবনের পথ খুঁজতে ভারতে পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। ছোটবেলা থেকেই মার্শাল আর্টের প্রতি ছিল তাঁর টান, কিন্তু একদিকে জীবিকা নির্বাহ, অন্যদিকে স্বপ্ন পূরণের তাগিদ-সব মিলিয়ে তাঁকে একাধিক দেশে ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি চলে আসেন ঢাকায়, যেখানে মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী পুর্বানি হোটেলের রান্নাঘরে কাজ শুরু করেন।

পুর্বানিতে অক্ষয়ের দায়িত্ব ছিল মূলত সহকারী শেফ হিসেবে সবজি কাটা, ক্যাটারিং বিভাগে সহযোগিতা করা এবং রান্নাঘরের নানা কাজ সামলানো। The Business Standard Bangladesh-এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তিনি সেখানে প্রায় ছয় মাস কাজ করেছিলেন। অনেকের কাছে এটি হয়তো সামান্য চাকরি মনে হতে পারে, কিন্তু সেই রান্নাঘরই তাঁকে শিখিয়েছিল অধ্যবসায় আর শৃঙ্খলার গুরুত্ব।

আইএমডিবি থেকে অক্ষয় কুমার

এরপর তিনি ব্যাংককে পাড়ি জমান। সেখানেও হোটেলে কাজ করার পাশাপাশি তিনি মার্শাল আর্ট শেখার সুযোগ নেন। ব্যাংককে কাটানো দিনগুলো তাঁর জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। কুংফু শেখার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন-শুধু রোজগারের জন্য নয়, নিজের স্বপ্নের পেছনে তাঁকে ছুটতেই হবে। ভারত ফিরে তিনি মডেলিং শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে সুযোগ পান।

তবে পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম দিকে একের পর এক অডিশনে ব্যর্থ হতে হয়েছে তাঁকে। কখনও বিজ্ঞাপনের ছোট্ট কাজ, কখনও নাচ শেখানোর ক্লাস-সবকিছু মিলিয়েই এগিয়ে চলেছিল তাঁর জীবন। কিন্তু ঢাকার রান্নাঘরে শুরু হওয়া সেই লড়াইয়ের মানসিকতা তাঁকে কখনও হাল ছাড়তে দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত “সৌগন্ধ” (১৯৯১) সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর “খিলাড়ি” সিরিজের ছবিগুলো তাঁকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়। পরিশ্রম, শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি একের পর এক হিট ছবি উপহার দেন। অ্যাকশন হিরো হিসেবে শুরু করলেও পরে কমেডি, রোমান্স, দেশপ্রেম-সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন।

অভিনেতার ইন্সটাগ্রাম থেকে

আজ তিনি বলিউডের অন্যতম সফল অভিনেতা। অভিনয়ে ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মশ্রী পেয়েছেন। এক সময় যিনি ঢাকার হোটেলের রান্নাঘরে ঘাম ঝরিয়েছেন, সেই মানুষটিই আজ একাধিকবার ভারতের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতার তালিকায় স্থান পেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সমাজসেবায়ও সক্রিয়-বিভিন্ন সময়ে দাতব্য কাজে এগিয়ে এসেছেন নির্ভয়ে।

অক্ষয় কুমারের এই যাত্রা আমাদের শেখায়-জীবনে কোনো কাজই ছোট নয়। ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই একসময় বড় স্বপ্নের সিঁড়ি তৈরি করে দেয়। ঢাকার পুর্বানি হোটেলের রান্নাঘরে সবজি কাটার কাজ হয়তো তাঁর জীবনের এক অজানা অধ্যায়, কিন্তু সেই সংগ্রামই তাঁকে তৈরি করেছিল এক অনন্য যোদ্ধা হিসেবে।

ছবিতে অক্ষয় কুমার,ইন্সটাগ্রাম থেকে।

তাঁর গল্প কেবল এক বলিউড সুপারস্টারের সাফল্যের ইতিহাস নয়, বরং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণা। যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু করলে আর ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করলে, তখন কিছুই অসম্ভব নয়। ঢাকার পুর্বানি হোটেল থেকে বলিউডের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়া অক্ষয় কুমারের জীবন তাই নিঃসন্দেহে এক আলোকিত দৃষ্টান্ত।

Leave a Comment