জন্ম পাকিস্তানে, বাবা-মা থাকতেন ভারতে-সেই অলিভিয়া এখন কোথায় কি করছেন?

নাসরিন জাহান জয়া:

বর্তমান প্রজন্মেরও অনেকে হয়তো অলিভিয়াকে চেনেন না। অথচ এই অলিভিয়া সত্তরের দশকে তরুণদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন। অত্যন্ত আধুনিক হওয়ায় চরিত্রের প্রয়োজনে যে কোন পোশাক পড়তে দ্বিধা করতেন না অলিভিয়া। সেই সময় খোলামেলা পোশাক পরে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে হাঁটুর উপরে পোশাক পড়া প্রথম অভিনেত্রী অলিভিয়া। সেই তিনি ১৯৯৫ সালের পর হঠাৎই উধাও হয়ে গেলেন। কেন তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেলেন? অলিভিয়া এখন কোথায়, কি করছেন?

অলিভিয়ার জন্ম বাংলাদেশে নয়, তার জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে ১৯৫৩ সালে খ্রিস্টান মধ্যবিত্ত পরিবারে। অলিভিয়ার বাবা-মা ছিলেন ভারতের গোয়ার বাসিন্দা। ১৯৪৫ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানের করাচিতে বসবাস শুরু করে অলিভিয়ার পরিবার। এরপর চলে আসেন ঢাকায়। অলিভিয়ার বাবা চাকরি করতেন ডেইলি অবজারভার পত্রিকার রিডিং সেকশনে। ছোট ভাই থাকেন আবুধাবিতে, বড় ভাই অভি ও আরেক ভাই ফুটবলার জর্জি থাকেন ঢাকাতেই। অলিভিয়ার চার বোনের মধ্যে বড় বোন থাকতেন কলকাতায়। ২০১১ সালে তিনি মারা যান। মেজো বোন ছিলেন বিমানের কেবিন ক্রু, এখন থাকেন আমেরিকায়। ছোট বোন থাকেন কানাডায়।

অলিভিয়া ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী হওয়ায় আধুনিক চিন্তাভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠেন। চলনে বলনে পোশাকে আশাকে তিনি ছিলেন খুবই আধুনিক। সেই সময় অলিভিয়া বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে বাস করলেও পোশাক পড়তেন পাশ্চত্য স্টাইলে। কিশোরী বয়সেই মডেলিংয়ে নাম লেখান অলিভিয়া। এরপর ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে কাজ শুরু করেন রিসিপশনিস্ট হিসেবে। চাকরিরত অবস্থাতেই বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছেন। হোটেলে চাকরি করার সময়ই অলিভিয়ার  আভিজাত্য এবং নজরকাড়া সুন্দরের জন্য চোখে পরে যান চিত্রপরিচালক এস এম শফির। ভালোবেসে ১৯৭২ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে শফিকে বিয়ে করেন অলিভিয়া। ওই বছরই স্বামীর পরিচালিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেল ছবিতে অভিনয় করে রুপালি জগতের রঙিন দুনিয়ায় পা রাখেন অলিভিয়া। অবশ্য এর আগে জহির রায়হানের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এ অভিনয় করার থাকলেও অজানা কারণে সেই জায়গায় ববিতা অভিনয় করেছেন।

শোনা যায়, জহির রায়হানের এমন সিদ্ধান্তে সবাই বিস্মিত হয়েছিলেন। এটা নিয়ে সে সময় প্রচুর আলোচনা ও সমালোচনা হয়। ঘটনার অন্তরালে নাকি ছিলেন বিখ্যাত দুই বোন সুচন্দা ও ববিতা। ববিতার ইচ্ছা ছিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট-এ কাজ করার। বড় বোন সুচন্দাকে বলতেই তিনি সব ম্যানেজ করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই। ছবিটি হাত থেকে এভাবে চলে যাওয়ায় কষ্ট পান অলিভিয়া।

তবে রুপ-সৌন্দর্য্যে অলিভিয়া বাংলাদেশের অন্য নায়িকাদের তুলনায় ছিলেন আলাদা। তার চেহারায় ইউরোপিয়ান সৌন্দর্য্য ছিল। অলিভিয়া ছিলেন যেমন লম্বা তেমনি ছিল গায়ের দুধে আলতা রং, যেটা বাংলাদেশের অনেক নায়িকারই ছিল না। ১৯৭৪ সালে মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রটি। এই ছবিতে অত্যন্ত খোলামেলা পোশাকে হাজির হন অলিভিয়া। ১৯৭৪ সালের বাস্তবতায় অলিভিয়া ‘ ও রানা ও রানা’ গানটির সঙ্গে যেভাবে আবেদনময়ী ভঙ্গিতে নিজেকে মেলে ধরেছেন সেটি ছিল অবিশ্বাস্য! সেখানে তাকে হাঁটুর উপর পোশাক পড়তে দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশে অলিভিয়ার আগে আর কাউকেই হাঁটুর উপর পোশাক পড়তে দেখা যায়নি। ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রে এন্টি হিরোইন চরিত্রে অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন অলিভিয়া। তারপর থেকেই আবেদনময়ী নায়িকা হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যান।

১৯৭৬ সালে অলিভিয়ার স্বামী এস এম শফি নির্মাণ করেন ‘দ্য রেইন’ চলচ্চিত্র। এই ছবিতে অলিভিয়া ‘মাসুদ রানা’র ‘ ও রানা, ও রানা’গানটিকেও ছাপিয়ে যান। ‘দ্য রেইন’ সিনেমার ‘মনে মনে যৌবনে লাগলো আগুন’ গানটিতে ওয়াসিমের সঙ্গে পানিতে যেভাবে অলিভিয়া জলকেলি করেছেন তা এখনকার ছবিকেও হার মানায়। স্বামী এস এম শফি অলিভিয়ার গ্লামার আর যৌন আবেদনকে ছবিতে নির্ধিদ্বায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘দ্য রেইন’ ছবি মুক্তির পর তুমুল আলোচনার জন্ম দেন অলিভিয়া। তাকে নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। ‘দ্য রেইন’ ছবিটি বাংলা ও উর্দু দুই ভাষায় নির্মিত হয়েছিল। ছবিটি দেশে-বিদেশে প্রচুর সাড়া জাগায়।

দ্য রেইন ছবিতে ওয়াসিম ও অলিভিয়া

একদিন হলে গিয়ে দর্শকদের সাথে সিটে বসে “দি রেইন”দেখছিলেন অলিভিয়া। পুরো সময় ধরে দর্শকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছেন। চঞ্চলা হাওয়ারে ধীরে ধীরে চলরে, একা একা কেন ভালো লাগেনা, চোখে যদি চোখ পড়ে যায় লজ্জা কেন পাই বলো-রুনা লায়লার গাওয়া এসব দারুন মেলোডিয়াস গানের সাথে দর্শকও সুর মিলিয়েছিল। যা দেখে আবেগে বোরকার আড়াল থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন অলিভিয়া। ছবি শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে অলিভিয়া যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এমন সময় পাশের একজন দর্শক বলে উঠেন,”আপনি অলিভিয়া। আপনার মুখ না দেখেও আমি আপনাকে চিনেছি। চিত্রালী পূর্বাণীতে আপনার পারফিউম ব্যবহারের আর্টিকেল পড়েছিলাম। আজ আপনার পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণই আপনাকে চিনিয়ে দিয়েছে”। উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গঠনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও অলিভিয়া এক পর্যায়ে খামখেয়ালি হয়ে ওঠেন। খোলামেলা চরিত্রে তার সানন্দে উপস্থিতি ভক্তরা মেনে নিতে পারেনি।

জন্ম পাকিস্তানে, বাবা-মা থাকতেন ভারতে-সেই অলিভিয়া এখন কোথায় কি করছেন?
‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রে অলিভিয়া

তবে এটা ঠিক যে, অলিভিয়াই বাংলাদেশের একমাত্র অভিনেত্রী যিনি মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাটির নাম ‘বহ্নিশিখা’। ববিতার পর অলিভিয়া দ্বিতীয় নায়িকা হিসেবে কলকাতার ছবিতে অভিনয়ের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তবে সত্তরের দশকে দাপটে অভিনয় করলেও অলিভিয়াকে চাপে ফেলে দেন রোজিনা ও অঞ্জু ঘোষ। বাংলা চলচ্চিত্রে এই দুজন এসে হিট-সুপারহিট ছবি উপহার দেয়ায় অলিভিয়ার হাতে ছবির সংখ্যা কমতে থাকে।

অলিভিয়াকে শেষবার রুপালি পর্দায় দেখা গিয়েছিল ১৯৯৫ সালে ‘দুশমনি’ ছবিতে। এরপর তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। অলিভিয়া রঙিন দুনিয়া থেকে বহু দূরে সরে গিয়েছেন। চলচ্চিত্রের লোকজনও খোঁজখবর করেও তার নাগাল পাননি। দুই যুগের ক্যারিয়ারে অলিভিয়া ৫৩টি ছবিতে অভিনয় করেন। জানা যায়, ১৯৯৫ সালে অলিভিয়ার পরিচালক স্বামী এস এম শফি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেন অলিভিয়া। শোনা যায়, ফতুল্লার মুনলাইট টেক্সটাইল মিলের কর্ণধার হাসানকে বিয়ে করে সংসার করছেন অলিভিয়া। বর্তমানে বসবাস করছেন বনানির ডিওএইচএস-এর বাড়িতে।”

Leave a Comment