ফারহান তানভীর :
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা পর্দায় যতবার এসেছেন, দর্শক তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়েছেন চরিত্রের গভীরতায়। ঠিক তেমনই একজন ছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান,যাঁর অভিনয় ছিল কখনও নির্মম, কখনও কৌতুকময়, কখনও বা নিঃশব্দ বেদনায় ভরা। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনকথা শুনলে বোঝা যায়, পর্দার আড়ালে এক শিল্পীর কতটা অপূর্ণতা জমে ছিল।

শিল্পীর পুরো নাম আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে। অভিনয়ের মানুষ হিসেবে তাঁকে আমরা যতটা চিনি, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচয় ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। তবু নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন-সারা জীবন টাকার জন্যই অভিনয় করে গেছেন, মনের মতো চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পাননি। এই স্বীকারোক্তি একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর নয় বরং এক অসম্পূর্ণ স্বপ্নবাহী মানুষের।
চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু ১৯৬৫ সালে। প্রথম অভিনীত ছবি ‘ন্যায়ী জিন্দেগি’ মুক্তিই পায়নি। শুরুটা তাই ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে পথচলা শুরু হলেও ১৯৭৪ সালে নয়নমণি ছবিতে অভিনয় তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মন্দ লোকের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের দৃষ্টি কাড়েন। এরপর একের পর এক খলনায়ক চরিত্রে তাঁকে দেখা যায়। পরিচালকেরা যেন তাঁর ভেতরের সেই কঠোর, দৃঢ় উপস্থিতিকেই বেশি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই জমতে থাকে আক্ষেপ-তিনি কি কেবল খলনায়ক বা কৌতুকের চরিত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে গেলেন?নিজের অভিনীত সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি আলাদা আবেগ দেখাতেন। সূর্য দীঘল বাড়ি,বিষবৃক্ষ,বিরহ ব্যাথা এসব ছবিতে কাজ করতে পেরে তিনি গর্ব অনুভব করতেন। কারণ এসব গল্পের ভিত ছিল সাহিত্যে, চরিত্র ছিল গভীর। তিনি সবসময় এমন কাজই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অভাব-অনটনের চাপে তাঁকে নিয়মিত কাজ করতে হয়েছে, যা এসেছে তা-ই গ্রহণ করতে হয়েছে। বড়লোকের সন্তান হলে হয়তো বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকতো-এ কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন।

অভিনয়ের আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল সাহিত্যিক হওয়ার। স্কুল জীবনে ‘অবহেলা’ শিরোনামের একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয় স্কুল সাময়িকীতে। সেই গল্প পড়ে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রশংসা করেছিলেন। সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য-যেমন সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্ত তাঁকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসতে অনুপ্রাণিত করে। অর্থাৎ অভিনয় তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল না; তিনি ছিলেন শব্দ ও ভাবনার মানুষও।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিয়মিত অভিনয় করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। ২০১৫ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য অর্জন করেন একুশে পদক। শতাধিক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার এবং তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা-সংখ্যার বিচারে তাঁর অবদান বিশাল। তবু নিজের শ্রেষ্ঠ অভিনয়টি করতে না পারার আফসোস তিনি শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়িয়েছেন।জীবনের শেষ দিকে নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। যিনি সারা জীবন লাইট, ক্যামেরা, এফডিসির কোলাহলে বেঁচে ছিলেন, তাঁর জন্য এই দূরত্ব ছিল কষ্টকর। শিল্পীর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হয়তো এখানেই-মনের ভেতরে চরিত্রেরা বেঁচে থাকে কিন্তু শরীর আর সাড়া দেয় না। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই একসময় খোঁজ নিলেও, শেষ দিকে সেই যোগাযোগ কমে আসে-এ বিষয়েও তাঁর আক্ষেপ ছিল।

২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চরিত্রগুলো আজও টিকে আছে। পর্দায় তাঁর হাসি, কড়া দৃষ্টি, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি-সব মিলিয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য অধ্যায়। হয়তো তিনি মনে করতেন, নিজের সামর্থ্যের পুরোটা দেখাতে পারেননি। কিন্তু দর্শকের স্মৃতিতে তিনি শুধু ভাঁড়ামি করেননি; বরং এক জটিল সময়ের শিল্প-বাস্তবতাকে নিজের শরীর ও কণ্ঠে বহন করেছেন।একজন শিল্পীর প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল পুরস্কারে নয়, সময়ের পরীক্ষায়। সেই পরীক্ষায় এ টি এম শামসুজ্জামান আজও প্রাসঙ্গিক-কারণ তাঁর গল্প শুধু সাফল্যের নয়, অসম্পূর্ণ স্বপ্নেরও। আর সেই অসম্পূর্ণতাই তাঁকে আরও বেশি মানবিক করে তোলে।